নীলাকাশ টুডেঃ নেপালকে পরাজিত করে ইতিহাস রচনা করল বাংলাদেশ নারী ফুটবল টিম। সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান সাবিনার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়ানশিপের মুকুট অর্জন করল বাংলাদেশ। সে কারণেই টিম অধিনায়ক সাবিনার জন্মস্থান সাতক্ষীরায় বইছে আনন্দের বন্যা। দরিদ্রতার সঙ্গে সংগ্রাম করে আজও টিকে রয়েছে সাতক্ষীরার তারকা ফুটবলার সাবিনা ও মাসুরা।

সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাসকালে ২০০৬ সাল থেকেই সাবিনার ক্রীড়া অনুশীলন শুরু। স্কুলের শিক্ষকরাই তার অনুপ্রেরণা। সাবিনার তারকা ফুটবলার হয়ে ওঠার লড়াইয়ে স্কুল শিক্ষক প্রয়াত আকবর আলী ও রাফিয়া ম্যাডামের অবদান অসামান্য। বর্তমানে শহরের সবুজবাগ এলাকায় কোনোক্রমে মাথা গোজার ঠাঁই হয়েছে সাবিনার পরিবারের। ২০০০ সালে তার পিতা সৈয়দ আলী গাজীর মৃত্যুর পর পাঁচ বোন ও মাকে নিয়ে সাবিনার পরিবারে নেমে আসে অনামিষার অন্ধকার। কিন্তু অদম্য সাহস ও প্রতিভা নিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে সাবিনা। একমাত্র পরিবারের সহযোগিতায় সাবিনা আজ তারকা ফুটবলার। দেশের জন্য বয়ে এনেছে সম্মান ও মর্যাদা।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সংগ্রাম করে ফুটবল ছিল তার ধ্যানে, জ্ঞানে। প্রতিটি খেলায় সাবিনার ক্রীড়া শৈলী ছিল খুবই আকর্ষণীয়। সাফ নারী চ্যাম্পিয়ানশিপের প্রতিটি খেলায় সাবিনা দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশ নারী ফুটবল টিমের নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাগতিক হিমালয় কন্যা নেপালকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে দেশের জন্য বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে এনেছেন। দলের বিজয়ে সাবিনা ও মাসুরার বাড়িতে বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে মিষ্টি নিয়ে শুভেচ্ছা জানানো অব্যাহত রয়েছে।

যার কাঁধে ভর দিয়ে বাংলার বাঘিনারা বাংলাদেশের কোটি মানুষের স্বপ্নটা পূরণ করেছে তিনি সাবিনা খাতুন। সেই সাবিনার হাতে শিরোপা দেখে খুশি তার মা ও বোনরা। তবে বাবাকে আজ মিস করছে পরবারের সবাই। সাবিনার মা মমতাজ বেগম মেয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।সবিনার বোন সালমা খাতুন বলেন, আমাদের ছোটবেলাটা অনেক সংগ্রামের। সাবিনা এবারের খেলায় খুব ভালো করেছে। সবকিছু মিলে খুবই গর্ব হয় ওর জন্য। তাদের পাঁচ বোনের মধ্যে শুধু সেজো বোন শিরিনার বিয়ে হয়েছে। তারপরও তারা সবাই মিলে একসঙ্গে থাকেন।

অপরদিকে, সাতক্ষীরা শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে বিনেরপোতা এলাকায় মাসুরার বাবা নতুন বাড়ি করেছেন। তাদের বাড়িতেও চলছে জয়ের উৎসব। মেয়ে ফুটবল খেলুক তা চাননি মাসুরা পারভীনের বাবা রজব আলী। তবে মেয়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে তাকে। অবশ্য মেয়ের জেদের চেয়ে মাসুরার কোচ আকবর আলীর চেষ্টা ও মাসুরার মা ফাতেমা বেগমের চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছেন রজব আলী। এখন মেয়েকে নিয়ে গর্ব করেন তিনি। সরকারের দেওয়া আট শতক জমিতে ইটের দেয়ালের ওপর টিনশেডের দুই কক্ষের ঘর তৈরি করে থ্যাকছে তারা। মাসুরার বাড়িতে গিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে উঠে আসে তার সংগ্রামী জীবনের গল্প।

শহরের বিভিন্ন এলাকার ভাড়া বাসায় থাকতেন মাসুরার পরিবার। শহরের নানা জায়গায় চায়ের দোকানও চালিয়েছেন তার বাবা। ভ্যানে করে ফল-সবজিও বিক্রি করেছেন। শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের সমস্যায় এখন সেভাবে কাজ করতে পারেন না তিনি। মাসুরারা তিন বোন। সবার বড় মাসুরা। মেজ বোন সুরাইয়াকে বিয়ে দিয়েছেন তার বাবা। আর ছোট বোন সুমাইয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।জাতীয় দলের ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের ফুটবলে আসার গল্প বলতে গিয়ে বাবা রজব আলী জানান, মাসুরা যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ত তখন থেকেই ফুটবলের প্রতি তার আকষর্ণ ছিল। পিটিআই স্কুলের মাঠে মেয়েদের খেলার অনুশীলন করাতেন তখন কোচ আকবর আলী। সাবিনারা যখন ওই মাঠে অনুশীলন করত তখন ক্লাস শেষ হওয়ার পর মাসুরা ওই মাঠে গিয়ে মেয়েদের বল কুড়াতো। এসব করতে করতে ওদের সঙ্গে একটা ভালো জানাশোনা তৈরি হয়। এরপর সেও খেলতেও শুরু করে।এদিকে, বাংলাদেশ নারী দলের অধিনায়ক সাবিনার নিজের শহর সাতক্ষীরার মানুষও অধীর অপেক্ষায় ক্ষণ গুনছেন, কখন ফিরবেন সাতক্ষীরায় সাবিনা ও মাসুরা।