আহসান হাবিব

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ডলারের দামও। তাই সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয় কমাতে সরকার নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সংকট মোকাবিলায় সব ক্ষেত্রেই সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বর্তমান সরকার। বড় বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা কিন্তু সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় না। দেশে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়, তৈরি হয় দুর্নীতির সুযোগ। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সম্পন্ন না হওয়া, বাড়তি সময় নেয়া- এ প্রবণতা রোধ করতে হবে কঠোরভাবে।

জ্বালানির ব্যবহার কমাতে মন্ত্রীদের গাড়ি নিয়ে বেশি ছোটাছুটি না করার নির্দেশনা দিয়েছেন বর্তমান সরকার। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতকেও সাশ্রয়ী হতে বলা হয়েছে। সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে সারাদেশে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা করে লোড শেডিং শুরু হয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতি ও অপচয় রোধেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সরকার। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলের দেশ। এ দেশের উপর দিয়ে চলে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা ফলে এদেশে এখনও এসির পরিমাণ যেমন ওইভাবে দরকার হয় না। আবার কোর্ট প্যান্ট পরে বেশি মাত্রার এসি চালানোর দরকার হয় না। ইংরেজরা আমাদের দেশে এসেছিল ব্রিটেন থেকে। শীতপ্রধান দেশ থেকে আসার কারণে কোর্ট স্যুট টাই তাদের পোশাক। আমাদের দেশে কেন ওই পোশাক ব্যবহার করে বেশি মাত্রার এসি ছেড়ে বড় কর্মকর্তা হতে হবে আমরা কেউ তা বুঝিনি। এসি ঢুকানোর পরিবেশ তৈরি করলে এসি লাগে নতুবা শুধু গরমের মৌসুমে একটু ফ্যান ব্যবহার করলেও এমন কোনো সংকট হয় না। এদেশে সবার ঘরে এসি নাই। গ্রামে এসির দরকার হয় না। কিন্তু এই দেশে যে পরিমাণ এসি চলে এটা বন্ধ করলে বিদ্যুৎ সংকট একদিনে মিটে যাবে। কিন্তু মানুষ সেখানে নেই। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহারে খাত, মিটার টেম্পারিং, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও বিদ্যুৎ বাঁচবে অনেক। এদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের সম্পদের হিসাব নিলেই দেখা যাবে কত অবৈধ লাইনের বখরা খেয়ে এরা কত মোটা-তাজা হয়ে আছে। সে খবর জানা নেই কারও। বিদ্যুৎ বাঁচাতে চাই দেশপ্রেম।

আমাদের কেন বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য জরিমানা হবে, আমরা কেন লুকিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করব? এর ব্যাখ্যা কি? এসবের কথা না ভেবে বলা হয় ইজিবাইকের কথা। বাংলাদেশে সাধারণত রিকশা, অটোরিকশা এবং ইজিবাইকের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। রিকশা বলতে পায়ের প্যাডেল চালিত তিন চাকার বাহন বুঝায়। আবার অটোরিকশা বলতে আমাদের দেশে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহন বোঝায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন মফঃস্বল শহরে এখন এই ইজিবাইক বা অটোরিকশাগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এই ইজিবাইকের উপর নির্ভর করে তাদের রুটি-রুজির সংস্থান করে। একদল মানুষ ইজিবাইক বন্ধে মরিয়া। তাদের যুক্তি হলো- অটোরিকশা ও ইজিবাইক সারাদেশে বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে। ঢাকাসহ জেলা শহরগুলোতে বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান কারণ নিষিদ্ধ ইজিবাইক ও অটোরিকশা। জেলা প্রশাসন বা ট্রাফিক বিভাগের কাছে অটোরিকশা বা ইজিবাইকের সংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও শুধু নারায়ণগঞ্জে যদি ৫০ হাজারের বেশি অটোরিকশা ও ইজিবাইক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাহলে সারা বাংলাদেশে এদের সংখ্যা কত হবে তা আপনাদের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়। ৮০ শতাংশ গ্যারেজেই নিষিদ্ধ এসব অটোবাইকের ব্যাটারি চার্জ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন। অনেক স্থানে চলছে মিটার টেম্পারিংয়ের মতো ঘটনা। এ ক্ষেত্রে মূল কথা হলো সারাদেশে লাখ লাখ ইজিবাইক চলছে। এই ইজিবাইক চীন থেকে আমদানি করা। এটা আমদানি কারা করেছিল? তখন কেন প্রশ্ন ওঠেনি। এখন এটা পত্র-পল্লবে বিকশিত এখন কেন কথা হচ্ছে? এটা যে ড্রাইভাররা চার্জ করায় তারা টাকা দিয়ে করায়। কিন্তু যার কাছে করায় সে কালো রাইন নিলে বা মিটার টেম্পারিং করলে সে দায় কার- ইজিবাইক চালকদের।

২০১৮ সালে বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশার গ্যারেজগুলোতে অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক অটোরিকশার গ্যারেজের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি কোটি টাকার উপরে জরিমানাও করেছে ডিপিডিসি ও টাস্কফোর্স। কিন্তু করোনা কালের পর এই অভিযান থেমে গেছে। বেশ কয়েকটি এলাকার অটোরিকশা গ্যারেজে ঘুরে জানা গেছে, এসব গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে অনেক বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। যে কারণে গ্যারেজ মালিকরা খরচ কমিয়ে বাড়তি টাকা আয়ের জন্য অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে থাকে। তবে এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার পেছনে রয়েছেন বিদ্যুতের অসাধু কর্মকর্তারা-ককর্মচারীরা। সারাদেশে সঠিকভাবে মনিটরিং করলে দেখা যাবে যে, হাজার হাজার অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। যে বিদ্যুতের দরকার হয় না সেখানেও দিনের বেলায় বিদ্যুতের বাল্ব চলছে। যার প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। আগে বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

অন্যান্য যানের চেয়ে তুলনামূলক ভাড়া কম হওয়ার কারণে মূল শহরে এবং তার বাইরে এখন যাত্রীদের প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশা। আর এগুলোর বেশিরভাগ চালকই সামান্য অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে বৈদ্যুতিক লাইন থেকে গাড়িগুলো চার্জ করিয়ে নিচ্ছেন।

এতে অটোরিকশা এবং ইজিবাইকের দোষ কোথায়? এই অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ লাখ পরিবার জড়িত। তাদের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন এই অটোরিকশা এবং ইজিবাইক। সাধারণ মানুষের মতে, যেখানে বিদ্যুতের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে সেখানে এই যানগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার বিদ্যুতের অপচয় ছাড়া আর কিছুই না। বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত স্পেশাল টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এসব বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা। বিদ্যুৎ বিভাগের যেসব কর্মকর্তারা অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে তাদের খোঁজে মাঠে নামা দরকার। মূল সংকটের জায়গা তৈরি করছে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের অবৈধ সংযোগ। সেগুলো ঠিক না করে ইজিবাইক চালকদের দোষ দিলে কি লাভ? দেশে যত এসি আছে সেগুলো যদি বন্ধ করা না যায় তাহলে ইজিবাইক চালকদের সংকট কোথায়? ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্য রোধ করা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট